,

কোরবানির হাটে পশুর ঢল, দাম পড়তি শেষবেলায়

জনমত ডেস্ক ।। শেষবেলায় জমে উঠেছে রাজধানীর পশুর হাট। অস্ট্রেলিয়ান, নেপালি, ভুটানি ও ভারতীয় গরুর পাশাপাশি শোভা পাচ্ছে উট আর দুম্বাও। এ ছাড়াও আছে নানা জাতের খাসি, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ। পছন্দসই পশু খুঁজে নেওয়ার মতো ক্রেতারও অভাব নেই। তারা কিনছেনও বটে। কিন্তু বিক্রেতারা বলছেন, দাম অনেকটাই পড়তির দিকে। এবার তাদের লোকসানও গুনতে হতে পারে। ভারতীয় গরু না আসার প্রচারণায় পশুর হাটগুলোতে এবার এসেছে প্রচুর দেশি গরু। যারা কখনোই হাটে গরু আনেননি, তারাও দু-চারটি গরু তুলেছেন। ফলে হাটগুলো নির্ধারিত সীমার বাইরেও অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া অবৈধভাবেও বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট হাট বসেছে। পশুর দাম নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। গতকাল সোমবার রাজধানীর একাধিক পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, সকালে ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকলেও দুপুরের পরপর হাট জমে ওঠে। সারারাত ধরেই চলে পশু বেচাকেনা। গাবতলীর পশুর হাটে কৃত্রিম উপায়ে পশু মোটাতাজা করার দায়ে দু’জন ভুয়া পশু চিকিৎসককে এক বছর করে ও দু’জন পশু ব্যবসায়ীকে দুই মাস করে কারাদণ্ড দেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে চলে এ অভিযান। হাটগুলোতে র‌্যাব-পুলিশের বুথ বসিয়ে টহল জোরদার করা হয়েছে। জাল নোট শনাক্তের মেশিনও বসানো হয়েছে। গাবতলীর পশুর হাটের কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, তাদের আপত্তির পরও ভারত ও মিয়ানমারসহ আশপাশের দেশগুলো থেকে গরু এসেছে। তাই গরুর দাম সেভাবে উঠছে না। অনেক বিক্রেতাই হতাশ এসব কারণে। পাবনার সাঁথিয়ার খামারি লালন মিয়া। গতকাল পর্যন্ত তার ১৫টি গরুর মধ্যে বিক্রি হয়েছে ছয়টি। প্রতিটি গরুতে তার লাভ হয়েছে সাত থেকে আট হাজার টাকা। বাকি নয়টি বড় গরুর আশানুরূপ দামই উঠছে না। গত বছর তার ১০টি গরুতে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিল। এবার গতবারের অর্ধেকও হবে না বলে মনে করছেন তিনি। আরেক খামারি ইসমাইল হোসেন জানান, মাঝারি আকারের গরুগুলো ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একটি গরুতে তিন-চার মণ মাংস পাওয়া যাবে। এবার পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে। ক্রেতারা সেটা বুঝতে চাইছেন না। নয়াবাজারে বড় গরুর ক্রেতা নেই :প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নয়াবাজার পশুর হাটের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাজারে প্রচুর গরু আসছে। বাজারের নির্দিষ্ট সীমানা পেরিয়ে মূল সড়কের দু’পাশেও তাঁবু খাটিয়ে সেসব গরু রাখা হয়েছে। অথচ ক্রেতা নেই বললেই চলে। হাটের উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থান নেওয়া আল বারাকা এগ্রোর ব্যানারে একাধিক গরুর দিকে দর্শকদের বেশ আগ্রহ দেখা গেলেও কেউ দাম করছেন না। স্বত্বাধিকারী জাহিদ হোসেন জানান, তাদের সবচেয়ে বড় গরুটির দাম সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। রাজস্থানি উলবারি জাতের এই ষাঁড়ের উচ্চতা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। একটি গরুতে প্রায় ১৭ মণ মাংস হবে বলে তার ধারণা। এ বছর তার খামারে এ ধরনের ২৬টি গরু ছিল। খামার থেকেই তিনি ১০টি বিক্রি করেছেন। বাকিগুলো হাটে এনেছেন। এ পর্যন্ত একটিও বিক্রি হয়নি। জাহিদ হোসেন আরও জানান, প্রতিবছরই তিনি গরু নিয়ে এই হাটে বসেন। এই হাটের একটি রেওয়াজ রয়েছে। এ হাটের ক্রেতারা মূলত পুরনো ঢাকার বাসিন্দারা। টেলিভিশনে হজের খুতবা শেষ অবধি শোনার পর ক্রেতারা এ হাটে আসতে থাকেন। সেই হিসাবে সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে ক্রেতা বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী।নাটোরের লালপুর উপজেলা থেকে ১৭টি গরু নিয়ে এসেছেন রায়হান। তিনি জানান, তার ভাই আসলামও এসেছেন ২২টি গরু নিয়ে এই হাটে। এ পর্যন্ত তারা মাত্র পাঁচটি গরু বিক্রি করতে পেরেছেন। যদিও তার সব গরুর মূল্য ৮০ হাজার টাকার কম। রায়হান জানান, রোববার সন্ধ্যায় মনে হচ্ছিল সোমবার হয়তো বাজারে গরুর সংকট হবে। কিন্তু রোববার রাতে এত বেশি গরু এই বাজারে এসেছে যে, সেই ধারণা পুরোপুরি পাল্টে গেছে। রায়হানের আশঙ্কা, কাঙ্ক্ষিত মূল্যে গরু বিক্রি করতে না পারলে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়বেন। কারণ গরু ফিরিয়ে নিতে আসা-যাওয়ার খরচ নিজের গাঁট থেকে বহন করতে হবে। বাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই বাজারে প্রায় ৩০টির মতো কাউন্টার খোলা হয়েছে গরু কেনাবেচার খাজনা সংগ্রহের জন্য। অনেক কাউন্টারে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্তও কোনো গরু বিক্রি হয়নি। মূল সড়ক সংলগ্ন আট নম্বর কাউন্টারের সামনে অর্গানিক এগ্রোর প্যান্ডেলে হরিয়ানা জাতের একটি গরুর দাম হাঁকা হয়েছে ছয় লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দাম উঠেছে তিন লাখ ২৫ হাজার টাকা। বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটি গরুও বিক্রি করা সম্ভব হয়নি বলে জানালেন অর্গানিক এগ্রোর স্বত্বাধিকারী সালাম তালুকদার।একইভাবে ঝিনাইদহ থেকে ৩৩টি গরু নিয়ে এসেছেন মালেক এগ্রোর প্যান্ডেলের জব্বার হাওলাদার। এই প্যান্ডেলে বেশ কয়েকটি মহিষ আর উটও রয়েছে। জব্বার সমকালকে বলেন, ক্রেতাদের ভাব বুঝতে পারছেন না। তাই এখনও অপেক্ষা করছেন। হয়তো শেষ মুহূর্তে ক্রেতারা গরুর দিকে ঝুঁকবেন। জব্বার হাওলাদার জানান, এ পর্যন্ত চারটি গরু বিক্রি করেছেন। এগুলোর মধ্যে একটি বিক্রি করেছেন তিন লাখ ৩৫ হাজার টাকায়। বসিলা হাটে পশু উঠেছে তিন লাখ :মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ থেকে বছিলা ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক এবং আশপাশের খালি জায়গায় অন্তত তিন লাখ পশু উঠেছে। শুক্রবার, শনিবার ও রোববার এ হাটে স্বল্পসংখ্যক পশু বিক্রি হলেও গতকাল থেকে বেড়েছে বিক্রি। এ হাটের ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যেও পশুর দাম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।২৮ লাখ টাকার গরু দেখতে ভিড় :উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের হাট ঘুরে দেখা গেছে, হাটের নির্ধারিত জায়গা ছাড়িয়ে ১২ ও ১৩ নম্বর সেক্টর এবং আশপাশের খালি জায়গাও পশুতে ভরে গেছে। ব্যবসায়ী ও ইজারাদাররা বলেছেন, অন্তত পাঁচ লাখ পশু উঠেছে উত্তরা হাটে। এ হাটে গরু, ছাগল এবং মহিষও উঠেছে প্রচুর। উত্তরা আবাসিক এলাকার প্রধান সড়ক থেকে অলিগলিও পশুর দখলে চলে গেছে। এতে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এ হাটে ৩৫ হাজার থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকা দামের গরুর সংখ্যা বেশি। তবে দেড় লাখ, দুই লাখ, তিন লাখ এবং এর চেয়ে বেশি দামেও গরু বিক্রি হতে দেখা গেছে। খাসি উঠেছে ১০-১৫ হাজার। বিক্রি হচ্ছে আট হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। তবে একটি বড় খাসির দাম হাঁকা হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। মহিষের দাম চাওয়া হচ্ছে ৪০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে মহিষ বিক্রি হচ্ছে না বললেই চলে। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর ব্যবসায়ী মো. আলাউদ্দিন তার একটি গরুর দাম চাইছেন ১৮ লাখ টাকা। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম উঠছে না বলে জানান তিনি। রাজশাহীর সদর এলাকার ব্যবসায়ী গফুর মিয়া একটি গরুর দাম চাইছেন ২৮ লাখ টাকা। তিনি জানান, ১০-১২ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম উঠছে। বিদেশি জাতের গরু দুটিকে ঘিরে মানুষের ভিড় লেগে আছে।শনির আখড়ায় দাম কম :শনির আখড়ার পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, এখানে প্রায় দুই লাখ পশু উঠেছে। রোববার পর্যন্ত হাটটিতে দাম চড়া থাকলেও গতকাল সকাল থেকে দাম কমছে। সোমবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই হাটে প্রচুর পশু বিক্রি হতে দেখা গেছে। ক্রেতারা জানান, পশুর দাম সহনীয়। ভাটারা হাটও কানায় কানায় ভরে উঠেছে পশুতে। ব্যবসায়ী ও ইজারাদাররা জানান, হাটে সব মিলিয়ে ১০ হাজার পশু উঠেছে। এ হাটের কয়েকজন ক্রেতা ও বিক্রেতা জানান, পশুর দাম কিছুটা কম। শনির আখড়ার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ৭৫ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছেন। এক লাখ বা তার বেশি টাকা দিয়ে কিনলে তার কেনা গরুর মাংস দ্বিগুণ পরিমাণ পেতেন বলে জানান তিনি। গাইবান্ধার সাঘাটার পশু ব্যবসায়ী বাহার হোসেন জানান, মাঝারি ১০টি গরুর বিপরীতে বড় গরু বিক্রি হচ্ছে দু-তিনটি। গাইবান্ধার আরেক ব্যাপারি নাজিম উদ্দিন বলেন, বেচাকেনা ভালো হলেও ভালো লাভ হচ্ছে ন?া। এলাকা থেকে বেশি দাম পড়েছে। ইজারাদারের প্রতিনিধি লোকমান হোসেন বলেন, এ বছর বেশি বিক্রি হচ্ছে ছোট ও মাঝারি আকারের গরু। ছোট গরু বিক্রিও সন্তোষজনক। বড় গরুর ক্রেতা আসবে মঙ্গলবার। অনলাইনে পশু বিক্রি :অনলাইনেও চলছে পশু বিক্রি। রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা সৈয়দ লিয়াকত হোসেন জানান, তারা চারজন মিলে একটি গরু কোরবানি দেওয়ার চিন্তা করেছিলেন। অনলাইনে ছবি দেখে যোগাযোগ করে গরু কিনে নেন। বিক্রেতারা গরুটি তার বাসায় পৌঁছেও দিয়েছে। দামও খুব বেশি পড়েনি। গতকাল হাটগুলোতেও দেখা গেছে অনলাইনে পশু বিক্রির বিজ্ঞাপন। গাবতলী হাটেও শোভা পাচ্ছে চারটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের অনলাইনে পশু সরবরাহের বিজ্ঞাপন।কয়েকটি অনলাইন বাজার ঘেঁটে দেখা গেছে, কোরবানির পশুর ছবি, ভিডিও ক্লিপ, জাতসহ পুরো বর্ণনা দেওয়া রয়েছে। পশু সরবরাহ থেকে শুরু করে কোরবানির স্থান এবং কসাই সুবিধাও দিচ্ছে অনলাইন বাজারগুলো। অনলাইন বাজার বিক্রয় ডটকম প্রতিষ্ঠানটির হেড অব মার্কেটিং ঈশিতা শারমিন জানান, অনলাইনে পশু বিক্রি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেকেই কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে হাটে যেতে পারেন না। অনেক পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তি দেশের বাইরে থাকেন। ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে তারা অনলাইনে কেনাকাটার দিকে ঝুঁকছেন।পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ই-কমার্স উদ্যোগ ‘পল্লী কোরবানি হাট’ নামে অনলাইনে দেশি গরু-ছাগল বিক্রি করা হচ্ছে। এখানে জাতভেদে ছাগলের দাম ১৩ হাজার থেকে ২৮ হাজার টাকা। গরু মিলছে ৫০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে। ক্লিকবিডি, আমারদেশবিডিসহ অন্যান্য অনলাইন বাজারেও কোরবানির পশু মিলছে ১০ হাজার থেকে ১৫ লাখ টাকায়।

বিষয় : পশুর ঢল দাম পড়তি

Share Button


     এ বিভাগের আরো খবর পড়ুন

বিজ্ঞাপন দিন