,

বাঙালি পরিবার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলা ভাষা

বাংলা ভাষা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সীমাবদ্ধ একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর কাছেই

জিসিএসই পরীক্ষায় ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বাংলাকে বন্ধ করে দিয়েছে বহু স্কুল

জনমত রিপোর্ট : আমরা কি মায়ের ভাষাকে হারিয়ে ফেলছি এই ব্রিটেনে? এটা সহজেই অনুমিত যে, প্রতিটি মাতৃভাষার জন্ম হয় একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেষ্টনের মধ্যে। যেখানে মানবশিশু জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠে। মাতৃভাষার মাধ্যমেই তার সেতুসংযোগ রচিত হয় পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, সমাজসংস্কৃতি, ব্যবহারিক জীবনের বিবিধ রীতিনীতি ও ধর্মাচারের সঙ্গে। মানস গঠনে এর প্রভাব তাই অনেক গভীরে প্রোথিত। প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন না হলে সহজে মানুষ প্রবাস জীবনে মাতৃভাষা পরিত্যাগ করতে চায় না। তাই এখনো বিশ্বের উন্মুক্ত দরজায় যেখানে বাঙালিরা পা ফেলেছেন সেখানেই তারা বাংলা ভাষাকে সযতনে ধারণ করেছেন। এই ব্রিটেনের মাটিতেও বাঙালি প্রথম বসতিস্থাপনকারী অথবা তার পরের প্রজন্মের মাতৃভাষার চর্চার প্রতি আগ্রহ এখনও উন্মুখ। তবে ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া অথবা বেড়ে ওঠা তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের অভিবাসী পরিবারে ক্রমশ ম্রিয়মান হয়ে আসছে বাংলা ভাষার চর্চা। এখানে জন্ম নেওয়া প্রজন্মগুলো এখন তাদের স্কুল, বন্ধু, প্রতিবেশি এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে একাত্র হয়ে যাওয়াকেই সহজ ও স্বাভাবিক বলে ধরে নিচ্ছে। অভিবাসী কিন্তু দেশের প্রতি মা-বাবার মমতার কারণে দ্বিতীয় প্রজন্ম হয়তো স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলাকে স্থান দিয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্মের কাছ থেকে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম বাংলাকে সেভাবে পাচ্ছে না। তাছাড়া তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান হাতিয়ার যেখানে ইংরেজি ভাষা সেখানে তারা ঘরে বাইরে সবখানেই অনায়েসে ইংরেজিতেই কথা বলছে। ইতোমধ্যেই এরকম বাঙালি হাজার পরিবার থেকে হারিয়ে গেছে বাংলা ভাষা। এসব পরিবারে বাবা-মায়েরা সন্তানের সাথে প্রতিনিয়ত ইংরেজিতে কথা বলছেন। ভাই-বোন আতয়-স্বজনের কথার লেনদেন হচ্ছে ইংরেজি ভাষাতেই। লেখক ফরীদ আহমদ রেজা বাংলা ভাষা চর্চা সীমিত হওয়ার কারণ হিসেবে বলেন, ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতায় এক সময় ব্রিটেনে বাংলা শিক্ষার নানা সুযোগ-সুবিধা চালু হয়। বিভিন্ন এলাকায় বাংলা স্কুল স্থাপিত হয়। মাতৃভাষা শিক্ষার জন্যে প্রদত্ত সরকারী অনুদান থেকে এ সকল স্কুলের শিক্ষকরা বেতন পেতেন। বর্তমানে সে অনুদান অত্যন্ত সীমিত বা বন্ধ হয়ে আসছে। এক সময় লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহাম, হ্যাকনি প্রভৃতি এলাকার বিভিন্ন সেকেন্ডারি স্কুল ছেলেমেয়েদের জিসিএসই পরীক্ষায় ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বাংলা গ্রহণ করার সুবিধা প্রদান করে। কোন কোন স্কুলে এ ব্যবস্থা এখনো চালু আছে। আবার বেশ কিছু স্কুল তা বন্ধ করে দিয়েছে। কি কারণে এ সকল স্কুল বাংলা বন্ধ করে দিয়েছে এর জবাবে অনেক কথা আছে। এর মধ্যে রয়েছে ছাত্ররা বাংলা পড়তে আগ্রহী নয়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাব, আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকার কারণে স্কুলকে ব্যয়-সংকোচন করতে হচ্ছে ইত্যাদি। এ সকল কারণের কোনটা সত্য এবং কোনটা খোঁড়া অজুহাত তা অন্বেষণ করার গরজ বাঙালি কমিউনিটির কারো আছে বলে মনে হয় না। এদিকে ব্রিটিশ সমাজ বাংলা চর্চার কিছুটা সুযোগ দিলেও বাঙালিরাই বরং বাংলার ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নন। যে সকল স্কুলে বাংলা শেখার সুযোগ রয়েছে সেখানেও দেখা যায় অনেক মা বাবা ছেলেমেয়েদের বাংলা শিক্ষার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। আনেক মা-বাবা জানেন-ই না তাদের সন্তান বিদেশী ভাষা হিসেবে কোন্ ভাষা শিখছে। অবস্থা এ ভাবে চললে আকিছুদিন পর এ দেশের স্কুলে বাংলা শিক্ষার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাক্লাস চালু রাখার জন্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ছাত্র না পেলে যে কোন স্কুল বাংলা শিক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দেয়ার অধিকার রাখে। তাই আগামীতে বাংলা ভাষা টিকে থাকবে কি-না এ নিয়ে এখনই প্রশ্ন উঠেছে। শুধুমাত্র এই শঙ্কা বাংলাকে ঘিরেই নয়। বিলেতের দক্ষিণ এশীয় দেশসমূহের অভিবাসী নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষায় কথা বলবে কি-না শঙ্কা আছে তাকে ঘিরেও। এছাড়া মিশ্র জাতির বিয়ের কারণেও মাতৃভাষার চর্চায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বার্মিংহামের অ্যাশটন ইউনির্ভাসিটির এশীয় শিক্ষার্থীর নিয়ে একটি গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে, মিশ্র পরিবারের প্রতি ২৫ জনের মধ্যে মাত্র ৫জন তাদের বাবা-মায়ের ভাষায় সাবলিলভাবে কথা বলতে পারছে। নতুন প্রজন্ম কেনো তার মায়ের ভাষায় কথা বলতে অনাগ্রহী গবেষণায় তারও কারণ খুঁজে বের করা চেষ্টা করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এদেশে জন্ম নেওয়া বাঙালি কিংবা দক্ষিণ এশীয় অধিকাংশ কিশোর-তরুণ তাদের মায়ের ভাষায় কথা বলতে এক ধরণের অস্বস্তিতে ভোগে। ঠিকমতো নিজের বাবা-মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারছে কি-না এই সংশয় থেকে তারা ইংরেজিতে কথা বলাকেই বেছে নিচ্ছে। এছাড়া তরুণরা ইংরেজি কথা বলাকে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার চাইতে বেশি আধুনিক বলে মনে করে, এটাও তাদের নিজ পূর্ব পুরুষের ভাষা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে, বাঙালি যে-সব পরিবারে দাদা কিংবা দাদী রয়েছেন এসব পরিবারে বাংলা ভাষার চর্চা তুলনামূলক বেশি। কিন্তু এসব পরিবার যখন শুধুমাত্র বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছে সে সব পরিবারে বাংলা ভাষার চর্চা কমে আসছে। বাংলা কিংবা অন্যান্য মাতৃভাষাকে টিকিয়ে রাখতে ভাষা গবেষকরা তাই বাবা-মাকে সন্তানের সাথে নিজের ভাষায় কথা বলাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন গবেষণার কথা। যেমন এডিনবারা ইউনির্ভাসিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি যে সব শিক্ষার্থী তাদের মাতৃভাষায় কথা বলছে, তারা তুলনামূলক বেশি মেধার সাক্ষর রাখছে। এদিকে ব্রিটেনে পরবর্তী প্রজন্মের যেমন বাংলা ভাষায় কথা বলার শঙ্কা তৈরি হয়েছে তেমনি বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে ব্রিটিশ বাঙালিদের আগ্রহের বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ব্রিটেনে বাংলা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সীমাবদ্ধ থাকছে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর কাছেই। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এসব কর্মকান্ডের নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণও একদম হাতেগোনা। বাঙালি সংস্কৃতি চর্চায় নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ পক্ষান্তরে বাংলা ভাষার চর্চা থেকেও দূরে সরিয়ে রাখছে এদেশে বেড়ে উঠা সন্তানদের। এ বিষয়ে লেখক ফরীদ আহমদ রেজা বলছেন, বিলাতে বাঙালির সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি হবার পরও এখানে বাংলা ভাষার ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। যারা বাংলা টিভি দেখেন, বাংলা পত্রিকা পড়েন তারা সবাই বাংলাদেশ থেকে বড় হয়ে এসেছেন। এ দেশে বেড়ে উঠা ছেলেমেয়েদের আমরা বাংলা ভাষার সাথে সম্পৃক্ত করতে পারিনি। এছাড়া বাংলাদেশে যারা বাংলাভাষা শিক্ষা করেন এবং শিক্ষা দেন তাদের মাতৃভাষা বাংলা। বিলেতে যে সব ছেলেমেয়ে বাংলাভাষা শিক্ষা করে তাদের অনেকের মা-বাবার মাতৃভাষা বাংলা হলেও তারা বাংলায় কথা বলে না। বাংলাভাষাকে নিজেদের প্রথম ভাষা বা ফার্স্ট ল্যাঙুয়েজ হিসেবে তারা বিবেচনা করে না। তারা নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলে। নিতান্ত বাধ্য না হলে তারা বাংলায় কথা বলতে অগ্রহী নয়। বিলেতে বহু ভিন্নভাষী লোকও বাংলাভাষা শেখেন। এ ধরণের ভাষাশিক্ষাকে আমরা দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করি। তাছাড়া বিলেতের অধিকাংশ বাঙালি বৃহত্তর সিলেট থেকে এসেছেন। সিলেট অঞ্চলের পরিবারে বাংলায় কথা বলার প্রচলন নেই। তাই বাংলাভাষাকে সিলেট থেকে আগত পরিবারে জন্মগ্রহণকারী শিশুর মাতৃভাষা বা প্রথম ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। স্মরণ করা যেতে পারে, বাঙালির প্রাণকেন্দ্র পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেনেই ছিলো তিন থেকে চারটি বাংলা বইয়ের দোকান। আজ তার একটিও টিকে নেই। সবশেষে গেছে সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান সঙ্গীতা। সঙ্গীতার মালিক শানূর মিয়া এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এই বাংলা বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়া এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে এখানকার বাঙালি পরিবারগুলোর সন্তানেরা যারা ব্র্রিটেনে বড় হচ্ছে তারা অনেকেই বাংলা সংস্কৃতির প্রতি অতোটা আগ্রহী নয়। শাহনূর মিয়া ব্রিটেনে বাংলা সংস্কৃতি কিংবা ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে বাঙালি সমাজের সমন্বিত চেষ্টার উপর জোর দেন। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য উদীচীর সভাপতি হারুন-অর রশীদ বলেন, মায়ের ভাষার মূল্য দেওয়া মানে হচ্ছে, নিজের সংস্কৃতি-আচার-আচরণের অনুগত থাকা আর তাকে উপেক্ষা করা মানে শেকড় থেকে দূরে সরে যাওয়া। তিনি অন্তত ঘরে সন্তানের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বাঙালি বাবা-মায়েদের প্রতি আহবান জানান।

 

Share Button


     এ বিভাগের আরো খবর পড়ুন

বিজ্ঞাপন দিন