,

হাজরে আসওয়াদ একটি নাম, একটি ইতিহাস

মুফতি আহসান উল্লাহ সিদ্দিকী

হজ্ব সম্পাদনকারীগণ প্রতি বছর হজ্বের বিশ্ব সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে হজ্বের বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। তার মধ্যে হাজরে আসওয়াদ অর্থাৎ কালো পাথরে হাত স্থাপন ও চুম্বন তত্ত্বও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। কাবা ঘরের পূর্ব কোণে ভূমি হতে প্রায় ৫ ফুট উপরে দরজায় অনতিদূরে দেওয়ালের মধ্যে কালো পাথর গাথা আছে। এই কালো পাথরের ইতিহাস সুদূরপ্রসারী।

পবিত্র কাবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, জমিন থেকে ১.১০ মিটার উচ্চতায় হাজরে আসওয়াদ স্থাপিত। হাজরে আসওয়াদ দৈর্ঘে ২৫ সেন্টিমিটার ও প্রস্থে ১৭ সেন্টিমিটার।

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেন, “হাজরে আসওয়াদ নামে কাল পাথরটি জান্নাত থেকে আসে, এটা দুধের চেয়েও সাদা ছিল, কিন্তু আদম সন্তানের পাপ এটাকে কাল করেছে”। [তিরমিজি শরীফঃ ৮৭৭, সুনানে আহমদঃ ২৭৯২ (ইবনে খুজায়মা হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন ৪/২১৯)]
নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘রোকনে আসওয়াদ অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিম বেহেশতের দুটো ইয়াকুত পাথর।’ (তিরমিজি)
ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম) ও পুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) কাবার প্রাচীর তৈরি করতে করতে যখন রুকনের স্থানে পৌঁছান তখন ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর নিবেদিত প্রাণপুত্র ইসমাঈলকে বলেনঃ “একটি সুন্দর পাথর খুঁজে নিয়ে এসো। পাথরখানা এখানে রাখবো। তাহলে মানুষের কাবা প্রদক্ষিণের চিহ্নের কাজ দেবে”। পুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) পিতাকে বলেনঃ “পিতা! আমি অত্যন্ত ক্লান্ত”। তিনি বলেনঃ “তবুও যাও”। তারপর পুত্র পাথরের সন্ধানে বের হলেন। এমন সময় জীবরাঈল (আলাইহিস সালাম) পাথরখানা নিয়ে আসেন (তারিখে মক্কা-ইবনে কাসীর)।

কাবা ঘর বহু ঘাত-প্রতিঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। তার সাথে হাজরে আসওয়াদ ও স্থানচ্যুত হয়েছে। এই কালো পাথরের সাথে বিশ্বনাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অ সাল্লাম) এর সম্পর্ক জড়িত। বিশ্বনাবীর নবুয়্যাত প্রাপ্তির অর্থাৎ নাবীরূপে আবির্ভাবের কয়েক বছর আগে কাবা ঘরের নির্মাণ কাজ চলছিল। কালো পাথরখানা দেওয়ালে স্থাপনের চিন্তা-ভাবনাও হচ্ছিল। তবে কে স্থাপন করবে? কোন গোত্র করবে? এ নিয়ে মক্কার অমুসলিমদের মধ্যে চরম অশান্তি, গোলযোগ, বিবাদ দেখা দেয়। কারণ তারাও পাথরখানার গুরুত্ব বুঝত।

আবু উমাইয়া ঘটনার পরিণতি উপলব্ধি করে বললেনঃ তোমরা শান্ত হও। যে লোক আজ সর্বপ্রথম কাবা ঘরে প্রবেশ করবে তার উপরেই সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব অর্পণ করবো। তোমরা কি এতে সম্মত আছো? বয়োবৃদ্ধ ও জ্ঞানবৃদ্ধের প্রস্তাবে সবাই সম্মত হল। দেখা গেল আরবের আল আমীন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলিইহি ওয়া সাল্লাম) কাবা ঘরে প্রথম এলেন। ঘটনা বলে সবাই তাঁর কাছেই সমাধান চাইলো। বিশ্ব সমস্যা সমাধানকারী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রত্যেক গোত্রের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে পাথরের কাছে গেলেন। বিশ্ব নবী চাদর বিছিয়ে স্বহস্তে হাজরে আসওয়াদখানা তুলে চাদরের মধ্যস্থলে রাখলেন। এবার গোত্রের প্রতিনিধিদের বললেন, সবাই চাদরখানা ধরে পাথরটি যথাস্থানে নিয়ে যান। নবীর চমৎকার পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট হয়ে সবাই তাই করল।

হাজরে আসওয়াদ জান্নাতের পাথর। তাই পাথর ফেরেশতাদের স্পর্শও আদম, ইব্রাহীম, ইসমাঈল (আলাইহিমুস সালাম) দের স্পর্শ জড়িত আছে। অতএব এই পবিত্র পাথর ভাবী বিশ্বনাবীর পবিত্র হাতেই যথাস্থানে স্থাপিত হওয়া উচিত। তাই নাবী (সাল্লাল্লাহু অলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাদরের উপর থেকে তুলে পাথরখানা যথাস্থানে স্থাপন করলেন।

বিশ্বনাবী(সাঃ)বলেনঃ আল্লাহর শপথ করে বলছি সত্যই আল্লাহ শেষ বিচারের দিন হাজরে আসওয়াদ পাথরটি পাঠাবেন। পাথরের দুটো চোখ হবে এবং দেখবে। একটি জিহবা হবে এবং কথা বলবে। যে লোক সঠিকভাবে পাথরে চুম্বন করবে ঐ পাথর সাক্ষ্য প্রদান করবে (তিরমিযী)।

মুসলমানরা কালো পাথরকে ভালমন্দের মালিক ভাবে না। উমারের(রাঃ) কথাটি বললেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যাবে। তিনি বলেনঃ “আমি স্পষ্টই জানি যে তুমি একটি পাথর মাত্র। তুমি আমাদের ভালো মন্দের, লাভ লোকসানের মালিক নও। বিশ্বনাবী (সাঃ)কে চুম্বন দিতে না দেখলে আমি তোমায় চুম্বন দিতাম না” (বুখারী)।

কালো পাথর চুম্বনের তাৎপর্য হচ্ছে-আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও ভালবাসার নিদর্শন। পাথর চুম্বনের দ্বিতীয় তাৎপর্য হচ্ছে-একই পাথরে একই স্থানে লাখ লাখ হাজীর চুম্বনে ভেঙ্গে যায় রাজা-প্রজার, মালিক-শ্রমিকের, শিক্ষিত-অশিক্ষিতের, আরব-অনারবের, কালো-সাদার,ধনী-নির্ধনের, ছুত-অছুতের বিভেদের জঘন্য প্রাচীর। এই শুভ লগ্নে বিশ্বের হাজীরা বিশ্বভ্রাতৃত্বে একত্রিত হয়। মালেকী, হাম্বলী, হানাফী, শাফেয়ী, শিয়া-সুন্নী বিভিন্ন মাজহাবের প্রাচীর খান খান হয়ে ভেঙ্গে সবার মুখ, হাত-এক মুখ, হাত হয়ে যায়। কেউ কাউকে ঘৃণা করে না। একজনের চুম্বনের জায়গায় অন্যজন চুম্বন দিতে অস্বীকার করে না।

মুসলিম বিশ্বের কোন মুসলিমও মানুষকে ঘৃণা করে না। সারা বিশ্ব তাদের স্বদেশ। তাই আল্লামা ইকবাল বলেনঃ “মুসলিম হ্যাঁয় হাম ওয়াতান হ্যাঁয় সারা জাঁহা হামারা” (আমি মুসলিম, সারা পৃথিবী আমার স্বদেশ)। এধরনের অন্তরের সম্প্রসারণ এবং দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হচ্ছে হজ্বের তথা বিশ্ব সম্মেলনের লক্ষ্য।

শুরুতে হাজরে আসওয়াদ একটুকরো ছিল, কারামিতা সম্প্রদায় ৩১৯ হিজরীতে পাথরটি উঠিয়ে নিজেদের অঞ্চলে নিয়ে যায়। সেসময় পাথরটি ভেঙে ৮ টুকরায় পরিণত হয়। এ টুকরোগুলোর সবচেয়ে বড়োটি খেজুরের মতো। টুকরোগুলো বর্তমানে অন্য আরেকটি পাথরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে যার চার পাশে দেয়া হয়েছে রুপার বর্ডার। রুপার বর্ডারবিশিষ্ট পাথরটি চুম্বন নয় বরং তাতে স্থাপিত হাজরে আসওয়াদের টুকরোগুলো চুম্বন বা স্পর্শ করতে পারলেই কেবল হাজরে আসওয়াদ চুম্বন-স্পর্শ করা হয়েছে বলে ধরা হবে।

এক বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত নূহ (আ•) এর তুফানের সময় হযরত জিবরাইল (আ•) পাথরটি আবু কুবাইস পাহাড়ে লুকিয়ে রাখেন হযরত ইব্রাহিম (আ•) কতৃর্ক কাবাঘর নির্মিত হলে তাওয়াফ শুরু করার স্থান চিহ্নিত করার লক্ষ্যে হযরত ইসমাইল (আ•) একটি পাথর তালাশ করার সময় হযরত জিবরাইল (আ•) ওই পাথরটি এনে দেন। অতঃপর হযরত ইব্রাহিম (আ•) তা বাইতুল্লাহ শরিফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে স্থাপন করেন।

হযরত আবদুল্লাহ বিন জোবায়েরের শাসনামলে মক্কায় ৭৫৬ সালে আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ হলে এটা কয়েক টুকরা হয়ে যায় ফলে রূপার আধারে সাজিয়ে সংযুক্ত করা হয়। ৯৩০ সালের প্রথমদিকে শিয়াদের একটি গ্রুপ কারমাতিরা এই পাথর চুরি করে বাহরাইনে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের নেতা আবু তাহের আল কারমাতি তার গড়া মসজিদ মাসজিদ আল দিরারে স্থাপন করেন হজ্জের স্থান পরিবর্তন করার দুরাশায়। আব্বাসীয় বংশীয় নেতারা বিপুল টাকার বিনিময়ে পাথরটি ৯৫২ সালে মক্কায় ফিরিয়ে আনেন।

মোদ্দাকথা হাদিস শরিফে হাজরে আসওয়াদকে বেহেশতি পাথর বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘রোকনে আসওয়াদ অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিম বেহেশতের দুটো ইয়াকুত পাথর।’ (তিরমিজি)  হাজরে আসওয়াদের স্থাপনের সাথে হযরত ইব্রাহিম(আঃ) ও তার পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) এর নাম জড়িত। বিভিন্ন ভাবে বর্ননা থাকলেও তারাই এই পাথরকে কাবায় স্থাপন করেছেন। হযরত মোহাম্মদ(সাঃ) এই পাথরকে চুম্বন করেছিলেন বলে তার উম্মতরা হজ্জে সরাসরি বা ইশারা করে চুম্বন করে থাকে।

এই পাথরের ভাল মন্দের কোন ক্ষমতা নাই। সুন্নতের অংশ হিসেবেই চুম্বনের রেওয়াজ জারী হয়েছে। হযরত উমর(রাঃ) এর বাণী। তিনি বলেছেন-“আমি জানি, তুমি একখানা পাথর, তোমার উপকার ও ক্ষতিসাধন করার কোনো ক্ষমতা নেই। রাসুলুল্লাহ (সাঃ)কে তোমার গায়ে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে আমি কখনো তোমাকে চুমু দিতাম না”

আমাদের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা বায়তুল্লাহ তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করেন। এভাবে ধাক্কাধাক্কি করে লোকদের কষ্ট দিয়ে তাওয়াফ করা ঠিক নয়। যদি চুম্বন দেয়া সম্ভব না হয়, ডান হাত দিয়ে ইশারা করলেও হবে। এর দিকে সম্প্রসারিত করে স্বীয় হস্তে চুম্বন করলেও সুন্নত আদায় হয়ে যাবে এবং আল্লাহপাক হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের বরকত দান করবেন।

রাহমানুর রাহিম আল্লাহতায়ালার কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছি তিনি যেন আমাদের স্মৃতিবিজড়িত পাথরটিকে চুম্বন করার তাওফিক দান করেন। আমিন।

Share Button


     এ বিভাগের আরো খবর পড়ুন

বিজ্ঞাপন দিন